শিশুর টিকা ও এর গুরুত্ব

প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল ২০২২, ৬:৫১ অপরাহ্ণ

টিকা কী?
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে যা কিছু শরীরে প্রবেশ করানো হয় তাই টিকা। টিকা সাধারণত মুখে খাওয়ানো হয় অথবা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয়।
কখন টিকা দিতে হবে:
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জন্মের পর সকল শিশুকে অবশ্যই টিকা দিতে হবে। প্রায় সকল অবস্থায়ই শিশুর টিকা দেয়া যায়। শিশুর টিকা দিলে সামান্য জ্বর ব্যথা হয়ে থাকে। কিন্তু টিকা না দিলে শিশু রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভুগে থাকা শিশুদের অবশ্যই টিকা দিতে হবে। কেননা এসব শিশুদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

সুতরাং টিকা দিলে সেই শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৩. যেসব কারণে টিকা দেয়া যাবে না

  •  খুব বেশি অসুস্থ শিশুকে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া টিকা দেয়া যাবে না।
  • পূর্ববর্তী পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেয়ার পর শিশুর খিঁচুনি বা অজ্ঞান হলে পরবর্তী প্যান্টাভ্যালেন্ট টিকা দেয়া যাবে না। এই ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল টিকা (ওপিডি, এমআর, হাম) নিয়ম অনুযায়ী দিতে হবে।
  •  অপরিণত এবং কম ওজনের শিশুকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে জানিয়ে টিকা নিতে হবে। সাধারণত ২.৫ কেজি ওজন হয়ে গেলে সেই সময় ওর টিকা শুরু করা যায়।

টিকা দেবার নির্দিষ্ট সময়:
জন্মের পরই শিশুকে বিসিজি টিকা দেয়া হয়। কোনো কারণে দেরি হলে পরবর্তী যেকোনো সময় বা প্যান্ট্যাভ্যালেন্ট এর প্রথম ডোজের সঙ্গে দিতে হয়। একই দিনে ও.পি.ভি এর প্রথম ডোজ দেয়া হয়। এরপর ৬ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট এবং পিসিপি এর প্রথম ডোজ শুরু হবে। এই টিকার ডোজ মোট ৩টি যা চার সপ্তাহ পরপর দিতে হয়। এই ছয় সপ্তাহ বয়সে ও.পি.ভি এর ডোজ দিতে হবে এবং তিনটি ডোজ চার সপ্তাহ পরপর দিতে হয়। আইপিভি এর দু’টি ডোজ ৬ এবং ১৪ সপ্তাহে দিতে হয়। ৯ মাস শেষে এমআর টিকার একটি ডোজ এবং ১৫ মাস শেষে এমআর টিকার ২য় ডোজ দিতে হয়।
টিকা দেবার স্থান:

  •  পিসিডি- মাংসের মধ্যে ইঞ্জেকশন
  •  বিসিজি- চামড়ার মধ্যে ইঞ্জেকশন
  •  পোলিও- মুখে খাওয়ানো এবং চামড়ায় ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে।
  •  প্যান্টাভ্যালেন্ট- মাংসের মধ্যে ইঞ্জেকশন
  •  এমআর- চামড়ার নিচে ইঞ্জেকশন

শিশুদের যেসব টিকা দেওয়া হয়:
ইপিআই এর অর্ন্তভুক্ত হলো পোলিও, বিসিজি, হেপাটাইটিসবি, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্যান্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি এবং এমআর। এর বাইরেও কিছু টিকা বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
পোলিও টিকা-
যদিও বাংলাদেশে পোলিও প্রায় নির্মূল হয়েছে তবু ভীষণ জরুরি। এই রোগে হাত-পা বাঁকা হওয়া এমনকি মস্তিষ্ক পর্যন্ত অকেজো হতে পারে।
বিসিজি টিকা-
এটি যক্ষ্মার প্রতিষেধক। এই টিকা দেবার পর বেশি ফুলে গেলে বা বেশি ঘা হলে পুনরায় টিকা দিতে হবে ডাক্তারের পরামর্শে।
ডিপিটি:
ডি তে ডিফথেরিয়া, পি তে পারটোসিস বা হুপিং কাঁশি এবং টি তে টিটেনাস। এই তিনটিই ঝুঁকিপূর্ণ রোগ। এই টিকা ৩টি রোগের প্রতিশেধক হিসেবে কাজ করে। কোনো অবহেলা না করে গুরুত্ব সহকারে শিশুকে এই ৩টি টিকা দিতে হবে।

হেপাটাইটিস-বি (হেপ বি):
হেপাটাইটিস বি লিভারের একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা হেপাাটাইটিস বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। তাই হেপাটাটিস বি টিকা জরুরি। বর্তমানে ইপিআই কার্যক্রমে পাঁচটি রোগ, যেমন-ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি,ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফাইলাস (ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি) বিরুদ্ধে একত্রে প্যান্টাভ্যালেন্ট ভ্যাক্সিন দেয়া হয়।
হাম:
এই টিকা শিশুদের স্বাস্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি মারাত্মক পীড়াদায়ক রোগ। সাধারণত শিশুর ১৫ মাস বয়সে এই টিকা দেয়া হয়। কোনো কারণে টিকা দেবার আগেই যদি শিশুর হাম হয়, তারপরও টিকা দিতে হবে।
টাইফয়েড:
টাইফয়েডের কারণে শিশুর যেকোনো অঙ্গ বিকল হতে পারে এবং শিশু স্বাভাবিক কার্যক্রম হারিয়ে ফেলতে পারে। টাইফয়েডের টিকা শিশুর এসব ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। দুই বছর বয়সের পর এই টিকাটি তিন বছর পরপর দিতে হয়।
রোটা ভাইরাস:
শিশুদের ডাইরিয়া হওয়া স্বাভাবিক বিষয় এবং ডায়রিয়া হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিক পরিচর্যায় বাচ্চারা সুস্থ হয়ে ওঠে কিন্ত রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ায় শিশু অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে উঠতে পারে। তাই রোটা ভাইরাস টিকা শিশুদের জন্য জরুরি। এই টিকা মুখে দেয়া হয়।
নিউ মোকক্কাল ভ্যাক্সিন:
বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিউমোনিয়াকে শিশু মৃত্যু হারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিউ মোকক্কাল ভ্যাক্সিন এই রোগটি প্রতিরোধে কাজ করে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাক্সিন:
ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ছোঁয়াচে ব্যাধি। যা প্রধানত মানষের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে। তাই বাচ্চাদের এই টিকা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব শিশুর হাঁপানি বা এলার্জিজনিত বিভিন্ন রোগ থাকে।
চিকেন পক্স:
চিকেন পক্স বা জলবসন্ত একটি ভাইরাস সংক্রামক রোগ। এই রোগের জটিলতা অনেক বেশি। তাই রোগ থেকে বাঁচতে বা রোগের তীব্রতা কমাতে এই টিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক:  কনসালটেন্ট, শিশু বিভাগ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।