দিরাইয়ের বীরাঙ্গনা প্রমিলা দাস

প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

 


দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামের প্রমিলা দাস মুক্তিযুদ্ধের সময় পিতার সংসারে বসবাস করতেন। মাত্র ১৭ বৎসর বয়সে বজেন্দ্র দাসের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার স্বামী ভাটি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। বর্ষা মৌসুমে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সারা রাত নৌকা বেয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যেতেন। স্বাক্ষী ছিলেন যুদ্ধের। বহন করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র। সরবরাহ করেছেন রসদ গোলাবারুদ।

অনেক দিন নিজের বাড়ি থেকেও রান্না বান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ করেছেন। স্থানীয় রাজাকাররা বজেন্দ্র দাসের গতিবিধি লক্ষ্য করে অগ্রহায়ণ মাসের কোনো এক তারিখে বাড়ি থেকে ধরে হাওরে নিয়ে গুলি করে। তার গুলিবিদ্ধ দেহটি নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে রাজাকাররা চলে যায়। ওরা ভাবে হয়তো মরে গেছে। তাঁর সেন্স আসার পর সুন্দর নামে জনৈক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ ব্রজেন্দ্র দাসকে গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে চিকিৎসা করান, তবে গুলি বের করতে পারেন নি।
প্রমিলা দাস তাঁর স্মৃতিচারণে জানান, একদিকে স্থানীয় রাজাকাররা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গুলি করে। অপরদিকে আমাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। গোপন এক জায়গায় রেখে আমার উপর নির্যাতন চালাতো। স্থানীয় রাজাকাররা দিনরাত আমাকে পাশবিক নির্যাতন করে। ৪ দিন পর তাদের হাত থেকে মুক্তি পাই। তবে মিলিটারী ক্যাম্পে আমাকে দেয়নি। বাড়িতে আসার পর দেখি আমাদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার দুদুকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। হাঁস মোরগ সহায় সম্বল সব নিয়ে গেছে। আমাদের গ্রামে আগুন দিয়ে পুরো গ্রামকে ছারখার করে দিয়েছে। বহু মানুষকে লাইন বেধে গুলি করে মেরেছে। আমার মনে হয় পেরুয়া গ্রামে সব চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করেছি। স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পর ২০১৮ সালে বীরাঙ্গনা হিসেবে আমার নাম গেজেটভুক্ত হয় এবং নিয়মিত ভাতা পাই। আমার স্বামী ২ বছর পূর্বে মারা যান। তিনি যে দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন সেই হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম গেজেটভুক্ত হয় নি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে অনেকবার আবেদন করেছি কোনো ফল পাইনি। আমি চাই আপনাদের মাধ্যমে আমার স্বামীর নাম তালিকাভুক্ত হোক। যাতে তাঁর অবদান জাতি জানতে পারে। ২ মেয়ে ও ১ ছেলে নিয়ে প্রমিলা দাসের সংসার। স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির অপেক্ষায় দিন গুনছেন তিনি।