নামছে বন্যার পানি: ভেসে উঠছে ক্ষত

প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২৪, ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ

বন্যার পানি নেমে গেলেও বানভাসী নিন্ম আয়ের মানুষের অনেকেই ফিরতে পারছেন না ঘরে। ঘর থেকে পানি সরলেও কাদা দুর্গন্ধসহ বন্যার ক্ষত দূর করার লড়াই করছেন তাঁরা। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই এই কষ্টে পড়েছেন।

রবিবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরে পানি ওঠা নিম্ন আয়ের ৩৫ পরিবারের মধ্যে মাত্র চার পরিবার বাড়ি ফিরেছেন। অন্যদের কারও ঘরে এখনো সামান্য পরিমাণে পানি রয়েছে। কেউবা ঘরের কাদা সরিয়ে (পেক কাইচ্ছা) প্রাণপণ চেষ্টা করছেন বাড়ি ফিরতে।
এরকমই একজন মর্জিনা বেগম। বললেন, আশ্রয়কেন্দ্রে আছি এখনো, পরিবারও ১০ জন মানুষ, সকালে আইছি (এসেছি), ঘরের পেক কাইচ্ছা পালানির (সরানোর) লাগি। হাটুইম্মা গারে (হাঁটু সমান ডাবে) কাইচ্ছা না পালাইলে ১৫ দিনেও ঘরও আওন যাইতোনায় (আসা যাবে না), দুই বছর আগে একবার ঘর পরিগেছিল, ইবারও পরিযার, ইলাখান (এইরকম) কেমনে বাঁচতাম।’

কেবল মর্জিনা বেগম নয়। গ্রামের ছালেহা বেগমেরও এমন কষ্ট। বললেন, পুরি’র (মেয়ের) জামাইয়েরে লইয়া আইয়া পেক টানতাছি (কাদা সরাচ্ছি), হিকানোতো (আশ্রয়কেন্দ্রে) থাকন যাইতোনায় (থাকা যাবে না)।
গ্রামের যুবক শামীম তার স্ত্রী আয়েশাকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের টিউবওয়েল থেকে এসে নৌকায় করে পানি নিচ্ছিলেন। বললেন, টিউবওয়েল পানির নীচে, এজন্য ওই টিউবওয়েলের পানি পান করছেন না।

গ্রামের যুবক কাওছার ভুইয়া বললেন, ৩৫ পরিবারের মধ্যে মাত্র চার পরিবার ঘরে ফিরেছে। অন্যদের ঘরে হাঁটু সমান কাদা।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনির হোসেন বললেন, ২০২২ সালে এই গ্রামের ৬০ থেকে ৭০ পরিবারের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরমধ্যে ৮ পরিবার সরকারি সহায়তার নগদ ১০ হাজার করে টাকা পেয়েছিল। এই পরিমান টাকা দিয়ে ঘর হবার মত নয়। তবুও ধার কর্জ করে এরা বসতঘর করে দুই বছরও থাকতে পারে নি। এইবারও গ্রামের ২৫০ বাড়ির সকল বাড়িতেই পানি উঠেছে। ৩৫ পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিল। এদের বেশি ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত চারটি পরিবার বাড়ি ফিরেছে। অন্যরা ফিরতে পারে নি। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে উঠেছে কেউ, কেউবা আশ্রয় কেন্দ্রেই আছে। গ্রামে বিশুদ্ধ পানিরও সমস্যা আছে। বেশিরভাগ টিউবওয়েল ডুবে গেছে। এখনো আছে পানির নীচে। এছাড়া টিউবওয়েল গুলোতে মোটর দিয়ে বিদ্যুতের সাহায্যে পানি ওঠানো হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি পাওয়া যায় না। ঈদের দিন বানের পানি এসেছিল। ওইদিন বিদ্যুৎও ছিল না। পানির জন্য হাহাকার ছিল গ্রামে। তিনি মনে করে গ্রামে কয়েকটি চাপ টিউবওয়েল থাকা জরুরি।
সরেজমিনে লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে বন্যার ক্ষত ও যে কষ্ট চোখে পড়েছে, এরচেয়েও খারাপ অবস্থা রয়েছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের গুয়াছুঁড়া, রৌযা, মৌকলা, ইছাগরি, আব্দুল্লাপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে। এছাড়া জেলার বন্যা কবলিত ৭৮ ইউনিয়নের অনেক গ্রামেই এমন দৃশ্য রয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সামর্থবানরা কোনভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও নিন্ম আয়ের মানুষ পড়েছেন মহাবিপাকে। তারা না পারছেন বাড়ি ফিরতে, না থাকতে পারবেন আশ্রয় কেন্দ্রে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, রবিবার বিকাল পর্যন্ত বন্যার পানি সরে যাওয়ায় ৮ হাজার বন্যার্ত মানুষ নিজ নিজ বাড়ি ফিরেছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন ১২ হাজার মানুষ।